দাদ হলে কি খাওয়া নিষেধ? কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা, ঘরোয়া সমাধান ও সম্পূর্ণ গাইড

দাদ হলে কি খাওয়া নিষেধ? দাদ (Ringworm) একটি সাধারণ ছত্রাকজনিত ত্বকের রোগ, যেটি চুলকানি, লালচে দাগ ও খোসা পড়া সৃষ্টি করে। এই পোস্টে আমরা জানাবো দাদ কেন হয়, কোন ছত্রাক দায়ী, দাদ হলে কি খাওয়া নিষেধ, কোন খাবার উপকার করে, কোন সাবান ব্যবহার করবেন, ঘরোয়া চিকিৎসা, প্রয়োজনে কোন ওষুধ খেতে হয়, এবং দাগ ও চুলকানি দূর করার কার্যকর উপায়।

সূচিপত্রঃ দাদ হলে কি খাওয়া নিষেধ

শরীরে দাদ কেন হয়

দাদ (Ringworm) হল ত্বকের একটি ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, যা প্রধানত ত্বকের ওপর লালচে, বৃত্তাকৃতি দাগ তৈরি করে এবং প্রায়ই তীব্র চুলকানি থাকে। দাদ হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো ছত্রাকের সংক্রমণ, আর্দ্র পরিবেশ, অত্যধিক ঘাম, টাইট কাপড় পরা, এবং সংক্রামিত তোয়ালে বা পোশাক ভাগ করে নেওয়া। পোষা প্রাণী—বিশেষত বিড়াল ও কুকুর—থেকেও মানুষে ছত্রাক ছড়াতে পারে। ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হলে বা ডায়াবেটিস থাকলে দাদ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, ঘাম শুকিয়ে রাখা, এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী ভাগ না করা দাদ প্রতিরোধে সহায়ক।

দ্রুত শনাক্ত করাই গুরুত্বপূর্ণ: সাধারণত দাদ ত্বকে গোলাকার লাল দ্বীপাকারে বা আঙুরের মতো ফাটলে দেখা দেয়—বর্ডারে লাল চৌকস রেখা আর মাঝে সামান্য ফ্লেকিং বা খসখসে ভাব। ত্বকের যে অংশে এই লক্ষণ দেখা যায়, সেখানকেই আক্রান্ত অংশ হিসেবে ধরে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে পুনরুদ্ধার দ্রুত হয়। মূলত, দাদ পরিবেশগত ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার ওপর নির্ভর করে, তাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও আকস্মিক ঘাম বন্ধ করার চেষ্টা হলে ঝুঁকি কমে।

দাদ রোগের জন্য দায়ী ছত্রাক কোনটি

সাধারণত ত্বকের দাদ রোগের জন্য দায়ী তিনটি প্রধান প্রজাতির ছত্রাক—Trichophyton, Microsporum এবং Epidermophyton। এগুলোকে একসাথে ডারমাটোফাইট বলা হয়। প্রতিটি প্রজাতি শরীরের বিভিন্ন অংশে আলাদা বৈশিষ্ট্যের সংক্রমণ সৃষ্টি করে।

ছত্রাকের নাম কোন অংশে দাদ তৈরি করে
Trichophyton শরীর, পা (অ্যাথলেটস ফুট), নখ ও কুঁচকি
Microsporum মাথার ত্বক (Tinea Capitis) ও শরীর
Epidermophyton কুঁচকি ও পায়ের দাদ

এই ছত্রাকগুলো গরম ও আর্দ্র স্থানে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সুইমিং পুল, জিম, শেয়ারের তোয়ালে বা কাপড় ইত্যাদি থেকে সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে। পোষা প্রাণীর সংস্পর্শ থেকেও মানুষে ছড়ায়—তাই পোষা প্রাণীর ত্বক যদি খসখসে বা লম্বা দাগ থাকে, সেটি পরীক্ষা করানো উত্তম।

দাদ থেকে কি ক্যান্সার হয়

সংক্ষেপে—না। দাদ একটি ছত্রাকজনিত সংক্রমণ; এটি ক্যান্সারে বিবর্তিত হয় না। দাদ এবং ক্যান্সার সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের রোগ। তবে দাদ দীর্ঘকালীনভাবে চিকিৎসা না করলে ত্বকে গভীর ক্ষত, স্থায়ী দাগ ও রঞ্জিতভাব দেখা দিতে পারে, যেগুলো অপ্রীতিকর ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিরক্তিকর হতে পারে।

আরো পড়ুনঃ হেলফিট ট্যাবলেট খেলে কি ক্ষতি হয়

আরও স্পষ্ট করতে—দাদ কখনো ক্যান্সারের জন্ম দেয় না, কিন্তু সংক্রমণ অবহেলা করলে সংক্রমিত স্থান সংবেদনশীল ও ইনফেকশনপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে। যেকোনো অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বা প্রচণ্ড ব্যথা দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত যাতে তা স্কিন ইনফেকশন না থেকে অন্য কোনো জটিলতায় পরিণত হয়।

দাদ হলে কি সাবান ব্যবহার করা যায়

হ্যাঁ—সাবান ব্যবহার করা যাবে, তবে সাধারণ সাবানের বদলে অ্যান্টিফাঙ্গাল বা অ্যান্টিসেপটিক সাবান ব্যবহার করা উত্তম। কেটোকনাজল বা টি-ট্রি অয়েলযুক্ত সাবান, সালফার সাবানগুলো আক্রান্ত ত্বক পরিষ্কার করতে ও ছত্রাকের পুনরাবৃত্তি কমাতে সহায়ক। সাবান ব্যবহারের পরে আক্রান্ত স্থান ভালো করে শুকিয়ে নিতে হবে, কারণ আর্দ্রতা ছত্রাক বৃদ্ধিতে সহায়ক।

কনসাল্টেশন পয়েন্ট: সুগন্ধি-ভিত্তিক সাবান, অতিরিক্ত ময়েশ্চারাইজিং সাবান বা শক্ত কেমিক্যালসমৃদ্ধ সাবান এড়িয়ে চলুন—কারণ এগুলো ত্বককে আরও ইরিটেট করে এবং ছত্রাককে বাড়িয়ে দিতে পারে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও শুকনো রাখাই মূল।

দাদ হলে কি খাওয়া নিষেধ

দাদ হলে খাদ্যাভ্যাসের দিকে বেশি মন দেওয়া দরকার। কিছু খাবার আছে যেগুলো ছত্রাক বৃদ্ধিতে সহায়ক—তাই সেগুলো থেকে দূরে থাকা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চিনিযুক্ত ও সুগারসমৃদ্ধ খাদ্য এড়িয়ে চলা; কারণ অতিরিক্ত শর্করা শরীরের অভ্যন্তরে ছত্রাক বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করে। একইভাবে অতিরিক্ত দুধজাত, চিজ-জাতীয় খাবার ও ফাস্টফুডও এড়িয়ে চলুন।

নিচে সহজ টেবিলে দাদ অবস্থায় কোন খাবার এড়াবেন এবং কোন খাবার খাওয়া উচিত তার সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হলো:

এড়াবেন খাওয়ার পরামর্শ
চিনি, মিষ্টি, সফট ড্রিঙ্ক রসুন, হলুদের খাবার, নিমিত্ত শাকসবজি
দই/চিজ/অতিরিক্ত দুধ ফল (ভিটামিন C), নারকেলের পানি
ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া প্রচুর পানি, গরম পানি

খাদ্যতালিকায় আরও আয়ত্ত আনতে চাইলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন-সমৃদ্ধ খাবার খান—যা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ছত্রাকের বিরুদ্ধে সহায়তা করে।

দাদ হলে কি ঔষধ খেতে হবে

ছোট, সীমানাবদ্ধ দাদ হলে সাধারণত টপিক্যাল অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম (যেমন কেটোকনাজল, ক্লোট্রিমাজল, মাইকোনাজল) লাগালে কাজ হয়। কিন্তু যদি সংক্রমণ বিস্তৃত হয়, নখ বা মাথার ত্বকে ছড়ায় বা ক্রিমে ভালো না হয়, তখন সিস্টেমিক অ্যান্টিফাঙ্গাল ট্যাবলেট প্রয়োজন হতে পারে।

আরো পড়ুনঃ কিডনি বিক্রি হাসপাতাল বাংলাদেশ – বাংলাদেশে কিডনির দাম কত

ওষুধের উদাহরণ—টেরবিনাফাইন, ইট্রাকোনাজল বা ফ্লুকোনাজল। এগুলো ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ অপরিহার্য, কারণ ট্যাবলেটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং লিভারের ওপর প্রভাবের সম্ভাবনা থাকে। নিজে থেকে দীর্ঘকাল ট্যাবলেট না খেয়ে প্রথমে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করুন।

দাউদের জন্য কোন ধরনের ট্যাবলেট খাওয়া যায়

দাউদ বলতে সাধারণত দাদই বোঝানো হয়। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা নিচের ট্যাবলেটগুলো প্রায়শই দেন—

ট্যাবলেট সাধারণ ডোজ প্রয়োগ ক্ষেত্র
Terbinafine 250 mg প্রতিদিন ১টি (চিকিৎসকের নির্দেশ) নখ/বড় এলাকাজুড়ে সংক্রমণে কার্যকর
Itraconazole 100/200 mg নির্দিষ্ট কোর্স (ডাক্তার নির্ধারণ) গভীর বা প্রতিরোধী সংক্রমণে
Fluconazole 150 mg সপ্তাহে ১ বার বা ডাক্তারের নির্দেশ কোনও ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়

ট্যাবলেট নেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করে লিভার ফাংশন যাচাই করা উচিত এবং ওষুধ চালানোর সময় নিয়মিত চেক-আপ করানো উচিত। গর্ভাবস্থা বা কিডনি/লিভার সমস্যার ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা নিতে হয়।

দাদ সারানোর কিছু ঘরোয়া উপায় কী কী

অনেক সময় মৃদু দাদের ক্ষেত্রে ঘরোয়া উপায় কার্যকর হয়। তবে সংক্রমণ বড় হলে বা ক্রমাগত বাড়লে ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন। নিচে কিছু পরীক্ষিত ঘরোয়া প্রতিকার দেয়া হলো—

  • রসুন: রসুনের অ্যালিসিন নামক উপাদান অ্যান্টিফাঙ্গাল। কাঁচা রসুন কচ κরে আক্রান্ত স্থানে লাগালে উপকার পাওয়া যায় (তবে সংবেদনশীল ত্বকে সতর্কতা)।
  • টি-ট্রি অয়েল: ১-২ ফোঁটা টি-ট্রি অয়েল নারকেল তেলে মিশিয়ে লাগালে কার্যকর। সরাসরি লাগাবেন না।
  • নিমপাতার সেদ্ধ পানি: নিমপ্রয়োগ স্থানীয় অ্যান্টিফাঙ্গাল প্রভাব দেয়।
  • হলুদের প্যাক: হলুদের অ্যান্টিসেপটিক গুণ দাদ কমাতে সহায়ক।
  • অ্যালোভেরা জেল: জ্বালা ও লালভাব কমায়, আর ত্বক আরাম দেয়।

ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহারের সময় যে জায়গায় লাগাবেন তা পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখতে হবে। প্রতিকার প্রয়োগের আগে ছোট অংশে টেস্ট করে দেখুন—এলার্জি বা ত্বক জ্বালাপোড়া না করার জন্য।

ঘরোয়া চিকিৎসা: দাদ হলে কি খাওয়া নিষেধ

ঘরোয়া চিকিৎসার পাশাপাশি ডায়েটে করণীয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপরের ঘরোয়া উপায়গুলো প্রয়োগের সময় নিম্নোক্ত খাদ্যপাতে বিরতি দিন—বিশেষ করে মিষ্টি, সফট ড্রিঙ্ক, অতিরিক্ত দুধজাত দ্রব্য, ফাস্টফুড এবং বেশি তেলযুক্ত খাবার। এগুলো শরীরকে ছত্রাক বৃদ্ধির অনুকূল করে এবং রোগ নিরাময়ে বাধা সৃষ্টি করে।

আরো পড়ুনঃ রক্তের গ্রুপ অনুযায়ী মানুষের বৈশিষ্ট্য কেমন হয়

পরিবর্তে রসুন, হলুদ, শাকসবজি, তাজা ফল এবং প্রচুর পানি গ্রহণ করুন। এছাড়া ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ খাবার ও প্রোবায়োটিক (যদি ডাক্তারের পরামর্শ দেয়) শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং পুনরায় সংক্রমণ রোধে সহায়ক।

দাদ চুলকানি দূর করার ঘরোয়া উপায়

দাদে চুলকানি খুবই বিরক্তিকর। ঘরোয়া কিছু প্রাকৃতিক উপায় দ্রুত আরাম দেয়—ঠাণ্ডা পানি বা বরফ প্যাক দিয়ে সেঁক দিলে চুলকানি কমে। বেকিং সোডা ও পানি মিশিয়ে পাতলা পেস্ট লাগালে ক্লান্তি কমতে পারে। অ্যালোভেরা জেল লাগালে সান্ত্বনা মেলে এবং জ্বালা-চুলকানি কমে। নিম-নারকেল তেল মিশ্রণও কার্যকর।

তবে চুলকানি অতিরিক্ত হলে, দাগ ফাটলে বা রক্তপাত হলে নিজে খোঁচাখুঁচি করবেন না—এতে সংক্রমণ বাড়তে পারে। প্রয়োজন হলে অ্যান্টিহিস্টামিন বা স্থানীয় স্টেরয়েড ক্রিম ডাক্তার নির্দেশমতে ব্যবহৃত হয়।

দাদের দাগ দূর করার উপায়

দাদ সারানোর পরে ত্বকে দাগ বা রঞ্জন থাকতে পারে। এগুলো ধীরে ধীরে হালকা হয়, তবে কিছু পদ্ধতি দ্রুত সাহায্য করে। অ্যালোভেরা জেল নিয়মিত মেখে দেখুন—এটি ত্বক পুনর্গঠনে সহায়ক। ভিটামিন-ই কনটেন্টযুক্ত অয়েল বা জেলও দাগ হালকা করে। লেবুর রস বা হলুদের প্যাক ব্যবহারে সতর্কতা থাকা উচিত—এগুলি সংবেদনশীল ত্বকে ইরিটেশন করতে পারে, তাই আগে ছোট অংশে পরীক্ষা করে নিন।

আরো পড়ুনঃ হাঁসের ডিমে কি এলার্জি আছে

সূর্যের আলোতে দাগ গাঢ় হয়ে যেতে পারে—এজন্য বাইরের কাজে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। যদি দাগ অনেক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ডার্মাটোলজিস্টে গিয়ে লেজার থেরাপি, কেমিক্যাল পিল বা পিগমেন্টেশন টার্গেটেড চিকিৎসা বিবেচনা করা যেতে পারে।

দাদ হলে কি খাওয়া নিষেধ – শেষ কথা

সংক্ষেপে—দাদ হলে মিষ্টি, সফট ড্রিঙ্ক, অতিরিক্ত দুধ/দই, ফাস্টফুড ও ভাজাপোড়া খাবার এড়াতে হবে। প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, শুকনো রাখা এবং ব্যক্তিগত আইটেম শেয়ার না করাই সবচেয়ে কার্যকর। ছোট সংক্রমণ অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম ও ঘরোয়া যত্নে ঠিক হয়ে যায়; কিন্তু যদি সংক্রমণ বিস্তৃত হয় বা দীর্ঘস্থায়ী হয়, অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন। স্বাস্থ্য ভাল থাকলে দাদ দ্রুত সারিয়ে ফেলা যায়—সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পরিচর্যা বজায় রাখুন।

নোট: এই পোস্টটি সাধারণ তথ্যের জন্য। চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তের জন্য একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

Author Image
Tanore Computer
আমরা আপনাকে প্রযুক্তির দুনিয়ায় সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে সবসময় প্রস্তুত।

Leave a Comment

error: Content is protected !!